
সাভারে ঈদুল আজহার আমেজের মাঝেই তৈরি পোশাক কারখানা আল-মুসলিম গ্রুপের ১৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে কর্তৃপক্ষ। ছুটি শেষে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে কারখানায় এলেও তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
শনিবার (৬ জুন) সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার উলাইল বাসস্ট্যান্ডের আল মুসলিম পোশাক কারখানার প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেন এসব শ্রমিক।
তারা জানান, কাজে যোগ দিতে এসে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেখতে পান তারা। ছাঁটাই করা শ্রমিকদের এক মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের দাবি, ২৬ ধারা অনুযায়ী তিন মাসের বেতন পরিশোধ করতে হবে।
অবিলম্বে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে না নিলে আরো কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।
১৩ বছর ধরে এই কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত আফানুর জানান, হঠাৎ মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সকালে কাজে এলে কর্তৃপক্ষ কারখানায় ঢুকতে দেয়নি।
একই ধরনের অভিযোগ করেন ৭ বছর ধরে কর্মরত রোজিনা আক্তার, ২ বছর ৫ মাস ধরে কর্মরত মো. রকিবুল্লাহ এবং ট্রেনিং সেন্টার থেকে সদ্য লাইনে আসা আছিয়া আক্তার।
তাদের অভিযোগ, তিন মাস ১৩ দিনের পাওনা দিয়ে ছাঁটাই করার নিয়ম থাকলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা মানেনি।
এদিকে দুপুরের পর ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিক সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী শ্রমিকরা বলেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের বের করে দিয়েছে। সকালে ঈদের ছুটি শেষে আমরা কারখানায় কাজে যোগদান করতে গেলে আমাদের আইডি কার্ড কেড়ে নেয় কর্তৃপক্ষ।
সুইং অপারেটর মাকসুদা আক্তার বলেন, সকালে অফিসে গিয়ে যখন কার্ড পাঞ্চ করতে গিয়েছি, তখন দেখি আমার পাঞ্চ নিচ্ছে না।
কর্তৃপক্ষ আমাদের পাওনা টাকা-পয়সা না দিয়েই জোর করে কারখানা থেকে বের করে দিয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কোথায় চাকরি পাব, কিভাবে চলব।
ভুক্তভোগী শ্রমিকরা বলেন, ঈদের ছুটির আগে আমাদের ২০ দিনের বেতন দেয়। আমাদের কোনো নোটিশ না দিয়ে ছাঁটাই করে তারা বলে যে, কারখানায় কাজ নেই। অথচ আমাদের ওভারটাইম করতে হয়। ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি।
ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। সমাবেশে অনেক শ্রমিক চাকরি হারানোর পর তাদের কী হবে, তা নিয়ে দুঃখ-দুর্দশার কথা জানিয়ে আক্ষেপ করেন।
একাধিক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২০ ধারা অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারলেও, ২১ ধারা অনুসারে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পরবর্তীতে কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সাপেক্ষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, সেটির কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
আল মুসলিম গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবু রায়হান জানান, শ্রমিকদের ২০ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে এবং তাদের পাওনা এক মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের ২৬ ধারায় তিন মাসের বেতন পরিশোধের বিষয়ে শিল্প পুলিশের সঙ্গে আলোচনা হয়নি এবং তিন মাসের বেতন আমরা দেব না। শুধুমাত্র এক মাসের বেতন কেউ না পেয়ে থাকলে তাদের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, কারখানায় অতিরিক্ত শ্রমিক হলে যাদেরকে সবশেষে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ছাঁটাই করতে হবে। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ ৫ থেকে ১০ বছর এবং তারও অধিক সময় ধরে চাকরি করা শ্রমিকদেরকে ছাঁটাই করেছে। আমরা এ ঘটনায় মানববন্ধন ও শ্রমিক সমাবেশ করেছি। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের চাকরিতে পুর্নবহাল করতে হবে। অনথ্যায় কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি আদায়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করেছে। এ ছাড়া মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়েছে বলে দাবি করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘আল মুসলিম গ্রুপের’ সাভার ও আশুলিয়ার তিনটি কারখানা থেকে একযোগে এসব শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। এর মধ্যে সাভার পৌর এলাকার উলাইল মহল্লায় অবস্থিত একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানা থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকায় অবস্থিত প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার কারখানার ৫২৯ জন ও আশুলিয়ায় অবস্থিত আল মুসলিম অ্যাপারেলস কারখানার ৫৩ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা রয়েছেন।





















