দক্ষিণ এশিয়ায় ন্যায্যতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে পানির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে

দক্ষিণ এশিয়ায় পানির ন্যায্য হিস্যা ও অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা, তথ্য ভাগাভাগি, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারের বক্তারা। তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার পানির রাজনীতি শুধু পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতা, ভূরাজনীতি, ন্যায্যতা, সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্বের প্রশ্ন।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের পঞ্চম তলার কনফারেন্স কক্ষে ‘দক্ষিণ এশিয়ার হাইড্রোপলিটিক্স: পানি বণ্টন, ক্ষমতা ও ভূরাজনীতি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সাউথ এশিয়া ইয়ুথ ফর পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি সোসাইটি এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মো. ইকবাল সরোয়ার।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের ফ্যাকাল্টি মুহাম্মাদ তানবীরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার পানির রাজনীতি বা হাইড্রোপলিটিক্স (Hydropolitics) বুঝতে হলে শুধু এই প্রশ্ন করা যথেষ্ট নয় যে, কোন দেশ কতটুকু পানি পাবে বা নিয়ন্ত্রণ করবে। বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও গভীর কিছু বিষয়। নদীর উজান ও ভাটির ভৌগোলিক অবস্থান, পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সুবিধা, তথ্যের প্রাপ্যতা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ—সবকিছু মিলেই নির্ধারণ করে একটি রাষ্ট্রের দর-কষাকষির সক্ষমতা।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর ভবিষ্যৎ শুধু পানি বণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি সহযোগিতা, ন্যায্যতা এবং যৌথ দায়িত্বের প্রশ্ন। নদীগুলো যেমন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে, তেমনি অসম ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কারণে বিভাজনের কারণও হতে পারে। ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা নির্ভর করবে দেশগুলো কতটা প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তথ্য ভাগাভাগি, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যেতে পারে তার ওপর।

মুহাম্মাদ তানবীরুল ইসলাম আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার পানির রাজনীতিতে প্রয়োজন ন্যায্যতা এবং বিশেষত ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক চরিত্রের অবসান, যা অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পানির অধিকারকে নিশ্চিত করবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

আলোচক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. এ. কে. এম. মাহফুজুল হক (মাহফুজ পারভেজ) বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের যে চেষ্টা, তা এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ভারত একপ্রকার বাংলাদেশের নদীগুলো হত্যা করছে। যার মাধ্যমে ভারত মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে। তিনি পানি ও নদী বিষয়ক সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করার জন্য মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ নিয়ে কাজ করার তাগিদ দেন এবং সরকারকে নীতি প্রণয়নের জন্য বিশেষজ্ঞ-নির্ভর উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সামচ্ছুদ্দিন ইলিয়াস বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলো নিয়ে একাডেমিক গবেষণা করা প্রয়োজন। আমাদের জিডিপিতে নদীগুলোর কত শতাংশ অবদান রয়েছে, তা গবেষণা করে বের করতে হবে। ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ পরবর্তীতে আমরা তা রিনিউ করব কি না, তা কেবল মেয়াদ বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়। বরং জলবায়ু পরিবর্তনকালীন এই সময়ে নতুন নতুন আরও কী ন্যায্য ধারা যোগ করা যায়, তা নিয়ে গঙ্গা চুক্তির আলোচনায় আমাদের অংশগ্রহণ করতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পানি বণ্টনের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে গবেষণাধর্মী তথ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জনবান্ধব চুক্তি করে পানি বণ্টনসহ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান তার আলোচনায় বলেন, তরুণ সমাজকে পানি ব্যবহারের নীতিমালা সম্পর্কে জানতে হবে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে এগিয়ে আসার জন্য তিনি সকলকে আহ্বান জানান।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং দৈনিক আমার দেশের আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ভূ-রাজনীতির অন্যতম একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিহার করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাস্তবধর্মী গবেষণার ভিত্তিতে দক্ষিণ এশিয়ায় পানির চুক্তি করে পানির ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের পানির ন্যায্যতা রক্ষায় তিনি তরুণদের ক্রিয়াশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।