০৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। সারা বিশ্বে সরকারি উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হলেও বাংলাদেশে সরকারিভাবে পালনের এমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। তবে ইউনেস্কো কমিশন, কিছু শিক্ষক সংগঠন ও দুই একটি এনজিও দিবসটি পালন করে থাকে।
১৯৬৬খ্রি. জাতিসংঘের উদ্যোগে এবং ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক সভায় প্রতি বছর ০৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উক্ত সভায় শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক একটি সুপারিশমালা গৃহীত হয়। ‘আইএলও’ এই সুপারিশমালা অনুসমর্থন করে। এই সুপারিশমালাটি মূলত বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য রচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ইউনেস্কো ও আইএলও-র ১৯৭৭ এবং ১৯৮৮ সালে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক আরো দুটি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। ফলে সকল স্তরের শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও কর্তৃত্ব সমন্বয়ে ইউনেস্কো-আইএলও একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করে। এসব নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলির উপর।
ইউনেস্কো দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে থাকে। এবারের প্রতিপাদ্য "The transformation of education begins with teachers" (শিক্ষার রুপান্তর শুরু হয় শিক্ষকদের মাধ্যমে)।
০৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাবিধ আয়োজনে দিনটি উদযাপন করা হয়ে থাকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একটি বিশেষ দিনে শিক্ষকদের সম্মানে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এদিন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মিষ্টিমুখ করান এবং বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। শিক্ষকরাও তা উপভোগ করেন এবং তাদের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের আশীর্বাদ করেন। শিক্ষকদের সম্পর্কে জাপানের প্রবাদে বলা হয়ে থাকে “Better than a thousand days of diligent study is one day with a great teacher.” ''সহস্র দিবসের পাঠ চর্চা অপেক্ষা একজন মহান শিক্ষকের একদিনের সান্নিধ্য অনেক ভাল।”। বিশ্বখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের মতে ‘যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রত তাঁরা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়’।
বাংলাদেশের শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষকের মর্যাদার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানা দুই শত বছরের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তেইশ বছরের পাকিস্তানী শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন ও শিক্ষা সংকোচন নীতি শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ফলে শিক্ষাদীক্ষায় আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম।
স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধু সরকারই যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষার ভিত রচনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আজন্ম স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন মানুষের মুখে হাসি ফোটানো তথা সার্বিক ব্রহ্মাস্ত্র হচ্ছে তাদের শিক্ষা সুযোগ অভাবিত করে তাদের শিক্ষিত, সৃজনশীল ও স্বাবলম্বী করা, জীবন ও জীবিকা যুদ্ধ উপযোগী করে আত্ম মর্যাদাবান জাতি গঠন। যার মূখ্য হচ্ছে শিক্ষক সমাজ। সেজন্য জীবিকার নিরাপত্তা ও মর্যাদার কথা তিনি ভাবতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে এক সঙ্গে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুই বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন পঁচাত্তর টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের বেতন একশত টাকা চালু করেছিলেন। তখন অনেকেই অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে ঐ মুহূর্তে শিক্ষায় এত বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন "আমি সোনার বাংলা গড়ব-এজন্য সোনার মানুষ চাই। সেই সোনার মানুষ তৈরি করবেন আমার শিক্ষকরা। তাদের পেটে খুদা রেখে সোনার মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়"। শুধু তাই নয় শিক্ষানীতি নির্ধারণ পর্যায়ে শিক্ষকদের মেধা মননের সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. এ.আর মল্লিক ও অধ্যাপক কবির চৌধুরীকে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা সচিব নিয়োগ দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি শিক্ষকদের যথাযত মর্যাদাকে সমুন্নত করেছিলেন। নিঃসন্দেহে শিক্ষকদের জন্য এটা অনেক গর্ব ও সম্মানের।
১৯৭৩ সালের ১৫ মার্চ শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমাদের এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে, যার দ্বারা চরিত্রবান, কর্মঠ এবং দক্ষ মানুষ সৃষ্টি করা যায়”। ১৯৭৫ সালের ২৮ জুন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'ভবিষ্যতে নেতৃত্বদানে সক্ষম চরিত্রবান নাগরিক তৈরি করুন'।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষকদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি শিক্ষকদের অত্যন্ত সমীহ করতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে গঠিত ১৮ সদস্য বিশিষ্ট শিক্ষা কমিশনের সদস্যরা কমিশনের প্রধান কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নিকট একটি সার্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক যুগান্তকারী রিপোর্ট পেশ করে। রিপোর্ট পেশের সময় কমিটির আহবায়ক ড. কুদরত-ই-খুদা বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন রিপোর্টটি একবার পড়ে দেখেন। রিপোর্টে কোন সংযোজন বিয়োজনের প্রয়োজন হলে তারা সেটা করে দেবেন। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমার স্যারেরা যে রিপোর্ট তৈরি করেছেন তার উপর কিছু করার যোগ্যতা আমার নেই”।
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ‘জুলিও ক্যুরি’ পদকে ভূষিত হলে বিশ্ব বাঙালি যুব সংস্থার সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক আবদুল মান্নান চৌধুরী ও শেখ ফজলুল হক মনির সাথে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে যান। শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মান্নান তো এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল’। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন,“আবদুল মান্নান আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বয়সে তরুণ হলেও সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাকে তো আর তুমি বলা যাবে না- এখন থেকে আপনি বলতে হবে”। প্রফেসর আবদুল মান্নান চৌধুরীর সাথে সস্প্রতি এক আলাপচারিতায় তিনি এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার অনেক দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। স্কুল জীবনে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষক পণ্ডিত সাখাওয়াত উল্লাহ পাটোয়ারী অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু নিজ মাথায় করে সেই শিক্ষকের বিছানপত্রের পুটলি-পাটরা পাটগাতি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্কুল শিক্ষক কাজী আবদুল হামিদের প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম সেবা সমিতি’তেও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে তাঁর শিক্ষক ব্রজেন্দ্রনাথ সূত্রধরকে সরকারি বাসভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেদিন তিনি সকল প্রটোকল ভেঙে নিজে গেটে এগিয়ে এসে ঐ শিক্ষকের পা ছুঁয়ে সালাম করে তাকে সসম্মানে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু নোয়াখালী সফরকালে সার্কিট হাউজে অবস্থানকালীন একজন বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি অত্যন্ত সম্মানের সাথে সাক্ষাৎ দেন এবং তাকে সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করেছিলেন। শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এরূপ অনুরাগ, ভালোবাস ও সম্মান জানানোর এরকম আরো অনেক নজির রয়েছে।
বাংলাদেশে এক সময় শিক্ষকদের কোন বেতনই দেয়া হতো না। তখন শিক্ষক বলতে বুঝাতো জীর্ণশীর্ণ চেহারা, চোখে ভাঙ্গা ফ্রেমের ফিতা ঝুলানো চশমা, পরনে মলিন পাজামা পাঞ্জাবি কিংবা লুঙ্গি, পায়ে ছেঁড়া জুতা কিংবা সেন্ডেল, হাতে তালি দেয়া ছাতা। তখন শিক্ষকদের সম্মান জানাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ির শাক সবজি, ফল-মূল, গাভীর দুধ, পুকুরের মাছ শিক্ষকদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হতো। বৃটিশ শাসনামলে ১৯৪৪খ্রি. শিক্ষকদের জন্য মাসিক ৫ (পাঁচ) টাকা ভাতা চালু হয়। কালের বিবর্তনে আমাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধাও বেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের গত ১৩/১৪ বছরে শিক্ষার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তথাপিও শিক্ষা খাতে এখনো নানাবিধ সমস্যা বিরাজমান। শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রেও অনেক ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৯৮% শিক্ষা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও গভর্নিং কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি নির্ভর করে এসব কমিটির ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর। ব্যবস্থাপনা কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিরা প্রবেশ করে থাকেন। তাদের অযাযিত হস্তক্ষেপের কারণে শিক্ষকদের মর্যাদা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে মারাত্বক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায় ব্যবস্থাপনা কিংবা গভর্নিং কমিটির এরূপ অযাচিত হস্তক্ষেপ। এ বিষয়টি সরকারে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।
মর্যাদার সাথে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধার বিষয়টিও জড়িত। একজন শিক্ষক যদি তাঁর জীবিকা নির্বাহের জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাপোর্ট না পান তখন তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি বা পার্টটাইম অন্য কোন পেশার সাথে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে সেটা তাঁর শিক্ষকতা পেশা বা সম্মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আবার শুধুমাত্র আর্থিক স্বচ্ছলতার উপরই একজন শিক্ষকের মর্যাদা নির্ভর করে না। শিক্ষকতা পেশা যেহেতু জ্ঞান চর্চা বা জ্ঞান বিতরণের। তাঁদের রাষ্ট্র বিনির্মাণ কিংবা পরিচালনার ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়া হচ্ছে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। এক সময় বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মত। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান, অধ্যক্ষ হুমায়ুন খালিদ, সামসুল হক-সহ অনেক শিক্ষকই জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব একবারেই নগন্য। অতিসম্প্রতি এক জরিপে জানা যায় জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় ৬০%। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রাজ্য সভা এবং বিধান সভায় শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব অন্যান্য যে কোন পেশার চেয়ে বেশি। উন্নত বিশ্বে তো আরো বেশি।
জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ঘোষিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৮% এবং সর্বশেষ ডাকারে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সভায় আপাতত জিডিপির ৬% বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ সরকারও এই সিদ্ধান্তে স্বাক্ষরকারী দেশ। কিন্তু আমাদের সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ২.০৮% এর বেশি বরাদ্দ এখনো দিতে পারেনি। অথচ ১৯৭০ এর নির্বাচনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু “সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হইতে পারে না। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে চার ভাগ সম্পদ শিক্ষাখাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন” বলে উল্লেখ্য করেন।
বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছেন। এই রূপকল্পের লক্ষ্য : মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ৫০০ ডলার (২০৪১ সালের মূল্যমানে ১৬ হাজার ডলারের বেশি), দারিদ্র্য দূরিকরণ, ২০৩১ অবদি ৯% জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, বিনিয়োগ/জিডিপি অনুপাত ৪৬.৯ শতাংশে বৃদ্ধি করা, রাজস্ব কর জিডিপির ১৫% পর্যন্ত বাড়ানো, রফতানি আয় ৩০০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করা, গড় আয়ু বাড়িয়ে ৮০ বছর করা, মোট জনসংখ্যার ৭৫% কে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা, ২০৩১ সালের মধ্যে প্রাপ্ত বয়স্কদের সাক্ষরতার হার ১০০% এ বৃদ্ধি করা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ১% এরও নীচে নামিয়ে আনা ও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির বিকেন্দ্রীকরণ প্রভৃতি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্ব উপযোগী করে তোলার মাধ্যমে রূপকল্প ২০৪১ লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে সরকার কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ঘোষণা করেছে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। এতে করে শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে সবাই আশা প্রকাশ করছেন। তবে শিক্ষার নতুন ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জও সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে এখন থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য বাজেটে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। শিক্ষকদের ব্যাপকভাবে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি তাদের পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশ গঠনে তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিশ্বের সকল স্তরের শিক্ষকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়ে সারা বিশ্ববাসী জাগ্রত হোক।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ (স্বাশিপ), সেক্রেটারী, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব টিচার্স ইউনিয়ন (WFTU)।
বি:দ্র: লেখাটি গতকাল ০৫ অক্টোবর 'দেশ রূপান্তর' পত্রিকায়' সম্পাদকীয় কলামে ছাপা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহাম্মদ নূরুল আমিন, সম্পাদকীয় কার্যালয়: চরফ্যাশন ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি (সিআইআইটি) রতন প্লাজার তৃতীয় তলা, সদর রোড, চরফ্যাশন, ভোলা।
ঢাকা অফিস: রায়পুরা হাউস (২য় তলা), ৫/এ, আউটার সার্কুলার রোড, পশ্চিম মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭ / যোগাযোগ : ০১৭১৬-২৩৭১০৮, ০১৭৬২-৪৪৭২২৮, ইমেইল : chattalanews@gmail.com