১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সংসদে গেল বিএনপি

ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি বলছিল, তাদের এমপিরা শপথ নেবেন না, সংসদেও যাবেন না। কিন্তু দলটি ঘণ্টার ব্যবধানে নিয়েছে নাটকীয় সিদ্ধান্ত। অবস্থান বদল করে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সংসদের পথ ধরেছে। দিনভর নানা নাটকীয়তার পর গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় শপথ নিয়েছেন বিএনপির চার এমপি। যোগ দিয়েছেন সংসদ অধিবেশনে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ‘সময় মতোই’ শপথ নেবেন।

একটি সূত্রমতে, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ কয়েকটি দাবি পূরণে সরকারের আশ্বাস পেয়ে সংসদে গেছে বিএনপি। তবে আরেকটি সূত্র জানাচ্ছে, কোনো আশ্বাসে নয়- এমপিদের চাপেই সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে দলটিকে। খালেদা জিয়ার নির্দেশ অনুযায়ী শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে দল আরও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ত। কারণ এমপিরা সংসদে যেতেনই। দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় তাই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিরুপায় হয়েই এমপিদের শপথ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।

বিএনপি সংসদে যাবে কি-না, তা নিয়ে ভোটের পর থেকেই চলছিল জল্পনা-কল্পনা। আওয়ামী লীগের তরফে দলটির প্রতি সংসদ বর্জনের ‘ভুল’ না করার আহ্বান ছিল। তবে বিএনপি ক্রমাগত বলছিল, সংসদে যাবে না। শপথ না নেওয়ার ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও’ হয়েছিল দলটির স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে। এমপিদের শপথ ঠেকাতে বৈঠক হয়েছে দফায় দফায়। উচ্চারিত হয়েছে শপথ নিলে শাস্তির হুঁশিয়ারি।

কিন্তু শপথ নিয়ে বিএনপির চার এমপি জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই তারা শপথ নিয়েছেন। তখন প্রায় সবাই ধারণা করেছিলেন, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। গত বৃহস্পতিবার শপথ নিয়ে বিএনপি থেকে বহিস্কার হওয়া ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি জাহিদুর রহমানের পরিণতি হবে তাদের।

এদিকে চার এমপির শপথ অনুষ্ঠানের ঘণ্টাখানেক আগেও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছিলেন, চাপ দিয়ে শপথ নিতে বাধ্য করে সংসদের বৈধতা পাওয়া যাবে না। তার আগে দুপুরে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল হানিফ বলেছিলেন, ফখরুল বাদে বিএনপির বাকি সবাই সংসদে যাবেন।

দিনশেষে সন্ধ্যাবেলায় বিএনপি গত চার মাসের অবস্থান বদলে ফেলে। গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই শপথ নিয়েছেন বিএনপির এমপিরা। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি নিয়ে সংসদে যাচ্ছেন তারা। সংসদে কথা বলার যে সামান্য সুযোগ রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে চান বিএনপির এমপিরা। জানা গেছে, শপথ নেওয়ার সময় চেয়ে গতকাল মির্জা ফখরুলও চিঠি দিয়েছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে।

সংসদে গেলেও দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাচ্ছে না। ২২ আসনে বিজয়ী জাতীয় পার্টি ইতিমধ্যে এ মর্যাদা পেয়ে গেছে। ছয় এমপির সংসদীয় গ্রুপ বিএনপি একটি সংরক্ষিত মহিলা আসন পাবে। খালেদা জিয়া কারামুক্তি পেলে এ আসনে তাকে দেখা যেতে পারে, এমন গুঞ্জন রয়েছে।

গত মাসখানেক ধরেই রাজনৈতিক গুঞ্জন চলছে, বিএনপি সংসদে যোগ দিলে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে থাকা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। গত দুই সপ্তাহে বিএনপি নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়া এই শর্তে রাজি নন। তিনি দলের এমপিদের শপথ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা স্বীকার না করলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির শর্তে বিএনপি সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করেছে। গতকাল এক অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল বলেছেন, এক দশকের বেশি সময় যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান দেশে ফেরার চিন্তা করছেন। রাজনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগের আশ্বাসে বিএনপি সংসদে গিয়েছে। তবে এ দাবি নাকচ করেছে আরেকটি সূত্র। এ সূত্রের খবর, বিএনপি সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও বিএনপির চার এমপি জাহিদুর রহমানের দেখানো পথে সংসদে যেতেনই। তাদের ঠেকানো যেত না। তাই বিএনপি বাধ্য হয়েই সংসদে গিয়েছে।

গতকাল সোমবার ছিল ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে নির্বাচিত এমপিদের শপথ নেওয়ার শেষ দিন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির ছয় এমপির পাঁচজনই শপথ নিয়েছেন গতকাল পর্যন্ত। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে এমপি পদ শূন্যের বিধান রয়েছে। তবে স্পিকার চাইলে ‘যৌক্তিক কারণে’ সময় বাড়াতে পারেন। বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুলের পদ শূন্যের আশঙ্কা তাই ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অভাবনীয় বিপর্যয় হয় বিএনপির। ৩০০ আসনের ২৮৩টিতে বিএনপির দুই জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের প্রার্থীরা ভোট পর্যন্ত টিকে ছিলেন। সব মিলিয়ে আট আসন পায় বিএনপির দুই জোট। বিএনপি ছয়টি, বাকি দুটি গণফোরাম। গণফোরামের দুই এমপি মৌলভীবাজার-২ আসনের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং সিলেট-২ আসনের মোকাব্বির খান এরই মধ্যে শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দিয়েছেন।

গতকাল শপথ নিয়েছেন মোশাররফ হোসেন (বগুড়া-৪), আমিনুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), হারুনুর রশিদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩) ও উকিল আবদুস সাত্তার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২)। শপথ নিয়ে তারা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজারে যান শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সেখান থেকে ফিরে রাত পৌনে ৮টায় যোগ দেন সংসদ অধিবেশনে।

অধিবেশনে হারুনুর রশিদ বলেন, ৩০ ডিসেম্বর কোনো নির্বাচনই হয়নি। এ নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। দলকে সংসদে আনতে তাদের চার এমপিকে অনেক ‘কাঠখড়’ পোড়াতে হয়েছে।

এর আগে শপথ নিয়ে অতীতে বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা উকিল আবদুস সাত্তার বলেন, তারা চারজন দলের সিদ্ধান্তেই সংসদে এসেছেন।

শপথ নিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশিদ বলেন, দলের অনুমতি নিয়েই সংসদে এসেছেন। তার মতে, এই সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না। কারণ ৩০ ডিসেম্বর কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনে যে ফল মানুষ প্রত্যাশা করেছিল, তা পায়নি। তাই বিএনপি এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে।

শপথ নিয়ে বিএনপি একাদশ সংসদকে মেনে নিচ্ছে কি-না- এ প্রশ্নে হারুনুর রশিদ বলেন, তারা সংসদকে বৈধতা দিতে আসেননি। দেশে আইনের শাসন, সুশাসন নেই, অরাজকতা চলছে, ১৭ কোটি মানুষ জিম্মি- এই বিষয়গুলো তুলে ধরতে এসেছেন।

শপথ নিয়ে বহিস্কার হওয়া জাহিদুরের প্রসঙ্গে হারুনুর রশিদ বলেন, তিনি (জাহিদ) তারেক রহমানের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তার ব্যাপারে দল পরে সিদ্ধান্ত নেবে। মির্জা ফখরুল কেন শপথ নেননি- এ প্রশ্নে হারুন বলেন, মহাসচিবের বিষয়ে তার বলার কিছু নেই। এ বিষয়ে তিনিই বলতে পারবেন।

তারেক রহমানের নির্দেশে সংসদে এসেছেন জানিয়ে হারুন বলেন, ভোট চুরির মাধ্যমে গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে ফরমায়েশি রায়ে কারাগারে রাখা হয়েছে। অথচ ফাঁসি ও মাদকের আসামির মতো জঘন্য আসামিরা জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকার অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিয়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে বলে আশা করছেন বিএনপির এই নেতা।

বিএনপির এমপিদের শপথের গুঞ্জন গতকাল সকাল থেকেই সংসদ সচিবালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় ছিল সংসদের প্রবেশমুখে। বিকেল ৫টায় হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে চার এমপি একসঙ্গে সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। এরপর তারা সংসদ ভবনে স্পিকারের কক্ষে শপথবাক্য পাঠ্য করেন। হারুনুর রশিদের সঙ্গে তার স্ত্রী সাবেক এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়াও উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: সমকাল