‘সুমি তুমি কী খাওয়াইলা? বুক জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে’

রাতের খাওয়া শেষে কামাল উদ্দিনকে গ্লাসে করে কোমল পানীয় দেন তাঁর স্ত্রী সুমি আক্তার। তা পানের পর কামালের বুকে-পেটে যন্ত্রণা শুরু হয়। ছটফট করতে থাকা কামাল তখন স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘সুমি তুমি কী খাওয়াইলা? বুক জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে।’ সুমি তখন কামালের কাছ থেকে গ্লাস কেড়ে নিয়ে নিজেও তা পান করেন। পরে গুরুতর অবস্থায় দুজনকেই নেওয়া হয় হাসপাতালে। সেই রাতেই কামাল মারা যান।

আদালতে দেওয়া সুমির (২৪) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং কামালের (৪৫) স্বজন ও মামলার এজাহার থেকে এ কথা জানা গেছে। রাজধানীর উত্তরখানে ৩ সেপ্টেম্বর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

কামালের বোন ফরিদা খাতুন ঘটনার পরদিন সুমির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর কামালকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে বিষ পান করিয়ে খুন করার কথা স্বীকার করে ঢাকার আদালতে স্বীকারোক্তি দেন সুমি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরখান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুজ্জামান আকন্দ আজ শনিবার বলেন, পরকীয়া প্রেমের জের ধরে সুমি তাঁর স্বামী কামালকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কোমল পানীয়ের সঙ্গে বিষ পান করিয়ে হত্যা করেছেন। সুমি এখন কারাগারে।

কোমল পানীয়তে বিষ
২০ বছর আগে সৌদি আরবে যান উত্তরখানের বাসিন্দা কামাল। পাঁচ বছর আগে গাজীপুরের মেয়ে সুমিকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন কামাল। এ দম্পতির আড়াই বছর বয়সী একটা ছেলে আছে। তার নাম আবু সুফিয়ান হাশমী।

পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, কামাল বেশির ভাগ সময় বিদেশে থাকতেন। দুই-এক বছর পর পর দেশে এসে মাস দু-এক থেকে আবার সৌদি আরবে চলে যেতেন। এ সময় সুমির সঙ্গে এক যুবকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই যুবক স্থানীয় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন।

কামালের বোন ফরিদা বলেন, তাঁর ভাই বিদেশে থাকার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা বেড়ে যায় সুমির। প্রথম দিকে সন্দেহ না হলেও পরে তাঁদের সন্দেহ হয়, কার সঙ্গে এত কথা বলেন সুমি। পরে জানা যায়, স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা। এ ঘটনা জানানোর পর কামাল গত মে মাসে সৌদি আরব থেকে একেবারেই দেশে ফেরেন।

এজাহারে ফরিদা বলেছেন, সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সুমি-কামালের দাম্পত্য কলহ চরম আকার ধারণ করে। দুজনের মধ্যে প্রায় ঝগড়াঝাঁটি হতো। সুমি প্রায়ই বলতেন, কামালকে হত্যা করবেন। নিজেও আত্মহত্যা করবেন।

কামাল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে উত্তরখানের কুড়িপাড়া এলাকায় নিজ বাসায় বসবাস করতেন। সেদিন কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে মামলার বাদী ফরিদা বলেন, রাতে সবাই মিলে একসঙ্গে সেদিন খাবার খান। খাওয়া শেষে সুমি কামালকে এক গ্লাস কোমল পানীয় দেন। কয়েক ঢোক খাওয়ার পর চিৎকার দিয়ে কামাল বলে ওঠেন, ‘সুমি তুমি কী খাওয়াইলা? বুক-পেট জ্বলে গেল?’ এ সময় কামালের মা সুমিকে বলেন, তাঁর ছেলেকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে বিষ খাইয়েছে কি না?

উত্তরখান থানার পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, পরিকল্পিতভাবে সুমি তাঁর স্বামী কামালকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে বিষ পান করিয়ে হত্যা করেছেন।

পুলিশ বলছে, আলামত হিসেবে কোমল পানীয়ের বোতল, কাচের গ্লাস ও স্টিলের একটি বাটি জব্দ করা হয়েছে। বাটিতে নীল রঙের তরল পদার্থ পাওয়া গেছে।

আদালতকে পুলিশ বলেছে, সুমি স্বীকার করেছেন, কোমল পানীয়তে ইঁদুর মারার বিষ তিনি মেশান। হত্যা মামলায় জব্দ করা এসব আলামত পরীক্ষার জন্য রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনিরুজ্জামান বলেন, কামাল খুনের মামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সুমির সম্পর্ক থাকা যুবককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কামালের বোন ফরিদা বলেন, আমার ভাই কামালকে সুমি হত্যা করেছে। সুমির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। নিউজ প্রথম আলোর।