নিমতলী আমাদের মগজে থাকেনি, চকবাজারও থাকবে না!

রুমানা জামান: আজকের চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই যে এতো আহাজারি, প্রিয়জনের অবুঝ অপেক্ষা, দম বন্ধ করা যন্ত্রনা এইসব ক’দিন মনে রাখবো আমরা? হাতে গুনে সপ্তাহ খানেক! তার বেশি হয়তোবা না। খবরের কাগজের প্রথম পাতা লাল কালিতে এক লাইনে চমকপ্রদ হেডলাইন আর সঙ্গে দুর্ঘটনার চকচকে ম্যাচিং ছবি ছাপা হবে। ভাব-গম্ভীর কিছু লেখাও ছাপা হবে সম্পাদকীয় পাতা জুড়ে।

আর টিভিতে কাজ করা মানুষগুলোর অনেকেই ঘটনায় নিহত স্বজনদরে চাপা আর্তনাদকে পুঁজি করে আরো খানকিটা উঁচুতে উঠাতে মরিয়া হবেন নিজেদের ক্যারিয়ার। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নতুন ইস্যু হবে। সিটিকর্পোরেশনের লোকজনও ধুয়ে-মুছে সব পরিস্কার করে ফেলবে নিমিষেই। এরপরে… আমরা বেমালুম ভুলে যাবো সব। নিমতলী আমাদের মগজে থাকেনি, চকবাজারও থাকবে না। আসলে কোন শোকই টেকেনা বেশিদিন।

অবাক লাগে! এত্তো ক্যামিক্যালের ভেতরে কীভাবে নিরাপদ থাকে মানুষের জীবন! শুধু চকবাজারে কেনো, এর বাইরে কতোশত ফ্যাক্টরি রয়েছে, যেখানে ম্যাক্সিমাম ফ্যাক্টরির ক্যামিকেল ম্যানেজমেন্ট ঠিক নাই। সেকেন্ডারি কন্টেম্পমেন্ট তো নাই-ই। নরমাল MSDS(মেটেরিয়াল সেইফটি ডাটা শিট) সেটাই নাই। দাহ্য রাসায়নিক হ-য-ব-র-ল অবস্থায় রেখে দিয়েছে। কোন ক্যামিকেল হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট নাই। থাকলেও নামকা ওয়াস্তে। এসব কর্তৃপক্ষের নজরে আসবে কবে?

সেই ২০১০ থেকে ২০১৯, পুরান ঢাকার বয়সটাই শুধু বেড়েছে কিন্তু ‘সাবধানতা’ শব্দটার ওজন বোধ করি আজও বুঝতে পারেনি ওই এলাকার সাধারণ মানুষ। কত স্বপ্নালু জীবন আর শেষ অবলম্বনের মৃত্যুর কারণ কেবল তাদেরই অবহেলা, অসচেতনার আর উদাসিনতা। পুরনো ঢাকার পয়সা ওয়ালা বাড়িওয়ালারা বুঝি একটু বেশিই লোভী। কয়েকটা টাকা বেশি ভাড়ার লোভে কতো সহজেই তারা কয়েক হাজার প্রাণের সওদা করে ফেলেন ৫০০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে। এই ভাড়া নেয়া বাসার আড়ালে একেকটা গোডাউন তুলে এর ভেতর কতোটা ভয়ঙ্কর মরন ফাঁদ লুকিয়ে রাখে তা নজরে এনে তদারকি করার কেউ নাই। এসব ব্যাপারে কার স্বার্থে মেয়র থেকে শুরু করে কর্তাব্যক্তিরা এতোদিন এমন নীরব ছিলেন কে জানে!

মাস দেড়েক আগে রিপোর্টার্স ইউনিটির পিঠা উৎসবের জন্য কিছু জিনিস কিনতে গিয়েছিলাম পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায়। কি এলোমলো দোকানপাট। গাদা করে রাখা কি সব রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক ম্যাটেরিয়াল। ঘিঞ্জি-রাস্তাগুলোর মধ্যদিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আশ পাশের পুরনো দালানগুলোর দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিলাম। কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছিলো নিঃশ্বাস। সঙ্গে থাকা পারুল আপাকে বলেছিলাম, বলোতো ক্যামনে থাকে মানুষ এমনভাবে! আবার যদি কখনো এইখানে আগুন লাগে তাইলে এই রাসায়নিক থেকেই লাগবে। এগুলো ঠিক-ঠাক না হলে আবারো দেইখো আরেকটা নিমতলী ট্র্যাজেডি হবে।

আল্লাহ মাফ করুন, নিমতলি আমাদের কিছু শেখায়নি, চকবাজারের শোকেরও একই পরিণতি না হোক।

(লেখিকা স্টাফ রিপোর্টার- দৈনিক ভোরের কাগজ, লেখিকার ফেসবুক থেকে নেয়া)