চট্টগ্রামে গৃহবধূ খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন গৃহকর্মী

নগরের কোরবানীগঞ্জ এলাকায় মঙ্গলবার দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে বাসায় ঢুকে ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে হত্যার ঘটনায় খুনিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দিনগত রাতেই অভিযান চালিয়ে খুনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবরটি নিশ্চিত করেছেন সিএমপির কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন।

তিনি বলেন, কোরবানীগঞ্জের গৃহবধূ রোকসানা বেগম হত্যার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে সেই খুনিকে। জব্দ করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জামও। তবে খুনির নাম-পরিচয় ও খুনের বিস্তারিত বুধবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে। আর এসব জানাবেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) আমেনা বেগম। এমনটাই বলেন ওসি মহসীন।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর কোরবানীগঞ্জে পাঁচতলা ভবনের চারতলার একটি বাসায় ছুরি মেরে হত্যা করা হয় গৃহবধূ রোকসানা বেগমকে (৪২)। আর কুপিয়ে আহত করা হয় তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে আবদুল আজিজকে (২১)। একই সময় কোপানো হয় প্রতিবেশী আবদুস সোবাহানকে (৬২)।

নিহত রোকসানার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানান নগর পুলিশের ওই কর্মকর্তা। মাকে খুন ও ছেলেকে ও আহত করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই ব্যক্তি এক প্রতিবেশীকেও ছুরি মারে। আহত আজিজ ও প্রতিবেশী আবদুস সোবাহান (৬২) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে চমেক পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শীলব্রত বলেন, আবদুল আজিজের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

হত্যাকাণ্ডের পর খবর পেয়ে ওই বাসা থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডি ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা।

নিহত রোকসানার বড় ছেলে মো. তারেক জানান, বাসায় দুই ভাই ও বাবা-মা থাকতেন। বাবা আবুল কাশেম গমের ব্যবসা করেন।

তারেক জানান, মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে বাবার সাথে অফিসে চলে যান তিনি। ছোট ভাই বাসার বাইরে এবং মা ওই সময় বাসায় একা ছিলেন। দুপুর ২টার দিকে প্রতিবেশীর কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি বাসায় যান।

রক্তমাখা ছুরি হাতে থাকা ‘খুনির’ সামনে পড়েছিলেন রোকসানাদের গৃহকর্মী ইয়াসমিন। তার ভাষ্য, দাড়িওয়ালা ওই ব্যক্তির পরনে ছিল কালো গেঞ্জি ও প্যান্ট।

ইয়াসমিন বলেন, ‘সকাল সোয়া ১১টার দিকে আমি বাসায় আসি কাজ করতে। কাজ শেষে ওপরের তলার (পঞ্চম তলা) বাসায় যাওয়ার সময় খালাকে বেতনের কথা বলি। তিনি উপরের বাসার কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় বেতন নিয়ে যেতে বলেছিলেন। পরে কাজ শেষ করে এ বাসায় ঢুকতেই ওই ব্যক্তি আমাকে ধরে ফেলে। সে সময় দাড়িওয়ালা ওই ব্যক্তি কালো গেঞ্জি ও প্যান্ট পড়া, হাতে রক্তমাখা ছুরি। আমি ভয়ে নিজেকে বাসার কাজের বুয়া পরিচয় দিয়ে তার পা ধরে ফেলি এবং দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে সে আমাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গালি দিয়ে নিচে বসিয়ে রাখে।’

ওই ব্যক্তি বিছানায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল জানিয়ে ইয়াসমিন বলেন, ‘পুরো ঘরে ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। এ সময় ভাইয়া (আজিজ) বাসায় ঢোকার সাথে সাথে পেছন থেকে তাকে ছুরিকাঘাত করে ওই লোক। ভাইয়াকে ও আমাকে টেনে বেডরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় তিনজনকে পুড়ে মরার কথা বলে এবং রান্নাঘরে গিয়ে কিছু কাপড় ও তুলায় আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সময় আজিজ পানি খাওয়ার কথা বলে দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলে ওই লোকও তার পেছনে দৌড়ে বের হয়ে যায়। আর আমিও এই সুযোগে বাসা থেকে বের হয়ে দ্বিতীয় তলায় বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে খবর দেই।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খুন হওয়া ওই পাঁচতলা ভবনে মোট নয়টি বাসা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বাড়িওয়ালা থাকেন। চারতলায় রোকসানার প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন এমদাদ। এমদাদের স্ত্রী শাহনাজ হোসেনের কাছেই জিজ্ঞেস করে রোকসানাদের বাসা চিনে নেয় খুনি।

ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) নোবেল চাকমা বলেন, পূর্বপরিচিত ব্যক্তির হাতেই খুন হয়েছেন গৃহবধূ রোকসানা বেগম। একই সময় তার ছেলে ও প্রতিবেশী ওই ব্যক্তি উপর্যুপরি ছরিকাঘাতে আহত হন।